রাত ৯:২৬, শুক্রবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

ফুল চাষে পরিবর্তন হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

ফুল চাষে পরিবর্তন হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

ফুল চাষে পরিবর্তন হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

ইমরান/ভোরের বার্তা:

এক বিঘা জমিতে ফুলের চাষ করলে লাভ হয় ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি। ধান করলে লোকসান তিন থেকে চার হাজার টাকা। তাই বছর বছর ফুলের আবাদ বাড়াচ্ছেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষক রফিকুল ইসলাম। তিনি পাঁচ বছর আগেও মাত্র তিন বিঘা জমিতে ফুল চাষ করতেন, এখন সেটা ১২ বিঘা ছাড়িয়েছে।
রফিকুল ইসলামের মতো প্রায় ১৬ হাজার কৃষক এখন দেশে ফুল চাষ করছেন। ১২ হাজার একর জমি এসেছে ফুল চাষের আওতায়। উৎসবে, জাতীয় দিবসে, দৈনন্দিন প্রয়োজনে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ফুলের জোগান আসছে দেশের কৃষকদের কাছ থেকে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে দেশে ফুলের চাহিদা বাড়ছে। উৎসবগুলো এখন আরও জমজমাটভাবে উদ্যাপিত হচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শোভা পাচ্ছে ফুল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, পারিবারিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না ফুল ছাড়া। এমনকি ঘরেও মানুষ এখন তাজা ফুল রাখছে ফুলদানিতে।
দেশে যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহ, সাভার, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর, গাজীপুর, মেহেরপুর, রাঙামাটি, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় ফুল চাষ হয়। বাণিজ্যিকভাবে বেশি হয় গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস ও জারবেরার চাষ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ১৮৯ একর জমিতে গোলাপের চাষ হয়েছিল। গত বছর তা বেড়ে ২৮১ একরে উঠেছে। গাঁদা ফুল চাষ ৯২৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪৬৭ একর। রজনীগন্ধার আবাদ ৬৬৬ একর থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৩৯ একর হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শুধু চাষ নয়, পরিবহন ও বিক্রি মিলিয়ে ফুলবাণিজ্যের সঙ্গে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ২০১৫ সালে দেশের ফুলের বাজার ও রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক একর জমিতে জারবেরা চাষ করলে একজন কৃষকের বছরে ২৫ লাখ টাকা মুনাফা হয়। এ ছাড়া গোলাপ চাষে দুই লাখ, গাঁদা চাষে এক লাখ ও গ্লাডিওলাস চাষে একরপ্রতি এক লাখ টাকা মুনাফা করতে পারেন কৃষকেরা।
যশোরের ফুলচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর বোরো ধানের আবাদ করে বিঘাপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তাই এ বছর তিনি ১০ বিঘা থেকে কমিয়ে ৫ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছেন। বাকি পাঁচ বিঘা ইজারা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ধানের চেয়ে ফুল চাষ অনেক লাভজনক। তাই তাঁর মতো যশোরের কৃষকেরা এখন অনেকেই ফুলের আবাদ বাড়াচ্ছেন।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকার মতো ফুল চাষে দেশের কৃষকেরা অনেক আগে থেকেই সিদ্ধহস্ত। এখন তাঁদের জমিতে ফুটছে জারবেরা, গ্লাডিওলাসের মতো আমদানি-বিকল্প ফুল। এমনকি অর্কিডও আবাদ হচ্ছে দেশে। তাই এখন আর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না।
আবদুর রহিম বলেন, দুই বছর আগে থেকে জারবেরা আমদানি একেবারেই কমে গেছে। আর গ্লাডিওলাস আমদানি বন্ধ হয়েছে প্রায় ১০ বছর হলো। ২০০৬ সাল থেকে গ্লাডিওলাসের বীজ উৎপাদন করছেন এ দেশের কৃষকেরা। এখন জারবেরার বীজ উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। কিছু কিছু ফার্ম এখন অর্কিডও উৎপাদন করছে।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ডিআইআরডি গ্রুপ ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে তুলেছে একটি অর্কিড ফার্ম, যার নাম দীপ্তা অর্কিডস। এখন সেই ফার্মের আকার প্রায় ২২ একর। সেখানে উৎপাদিত অর্কিড ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল ও কক্সবাজারের হোটেলে সরবরাহ করা হয় বলে জানান কোম্পানিটির বিপণন বিভাগের কর্মী তানভীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমদানি করা অর্কিড প্রতিটি ৩০ টাকা বা তার বেশি দরে বিক্রি হয়। আর আমরা বিক্রি করতে পারি ২০-২৫ টাকায়।’
সম্প্রতি ‘দেশিফুলডটকম’ নামের একটি ই-কমার্স সাইট গড়ে উঠেছে। তারা ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে অনলাইনে আদেশ নিয়ে ফুল সরবরাহ করছে।
ওই প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য উন্নয়ন ব্যবস্থাপক আশরাফ উল জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এ ব্যবসা শুরু করে মাস খানেকের মধ্যেই বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। প্রতিদিন ৭ থেকে ১০টি সরবরাহ আদেশ আসছে। ভবিষ্যতে আমরা বিনিয়োগ ও আওতা আরও বাড়াব।’
রপ্তানি সম্ভাবনা: বাংলাদেশ থেকে কিছু কিছু ফুল রপ্তানি হয়। তবে পরিমাণে নগণ্য। ব্যবসায়ীরা বলেন, সবজির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কিছু ফুল এ দেশের রপ্তানিকারকেরা পাঠিয়ে থাকেন। তবে সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও জাপানে বাণিজ্যিকভাবে ফুল রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আবদুর রহিম বলেন, ফুলের কিছু নমুনা ওই দুই দেশে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো তারা কিছু জানায়নি।
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ফুলের বাণিজ্য হয় নেদারল্যান্ডসকে ঘিরে। দেশটির ছোট শহর আলসমিরে এক বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি বাজার আছে, আর আছে একটি বিমানবন্দর। ওই বাজার ও বিমানবন্দর ব্যবহার করা হয় ফুলবাণিজ্যের জন্য।
ব্যবসায়ীরা বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইথিওপিয়া, কেনিয়া, ইকুয়েডর, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফুল আমদানি করে পুনরায় রপ্তানি শুরু করেছে নেদারল্যান্ডস। বাজার দেখে রিলায়েন্স, আইটিসি ও টাটার মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান ভারতে ফুল উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে।
ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, বাংলাদেশ থেকে ফুল রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*